• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং
হিন্দু বিধবা নারীরা স্বামীর অকৃষি জমিই (বসতভিটা) নয়, কৃষিজমি অংশীদারিত্ব পাবেন

হিন্দু বিধবা নারীরা শুধু স্বামীর অকৃষি জমিই (বসতভিটা) নয়, কৃষিজমিরও অংশীদারিত্ব পাবেন বলে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ রায় দেয়।

৮৩ বছর ধরে স্বামীর কৃষিজমিতে কোনো প্রাপ্য ছিল না হিন্দু বিধবাদের। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে এ অসংগতি দূর করে গতকাল রায় দিল হাইকোর্ট।

এ রায়ের ফলে হিন্দু নারীরা সেই উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি পেলেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনীতিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা এ রায়কে যুগান্তকারী রায় হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ৮৩ বছরের গ্লানি থেকে মুক্ত হলো বাংলাদেশ। এ রায়ে শুধু হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকারের স্বীকৃতিই নয়, বাংলাদেশের মর্যাদাও বেড়েছে। তবে এ সংক্রান্ত আইন সংসদে প্রণয়ন চান বিশিষ্ট আইনজীবীরা। তারা বলেন, শুধু স্বামীর সম্পত্তি নয়, আমরা চাই বাবার এবং স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু নারীদের সমান ভাগ।
খুলনার বাটিয়াঘাটা এলাকার অধিবাসী গৌরী দাসের নামে তার স্বামীর কৃষিজমি রেকর্ড হয়। ওই জমি রেকর্ডের বিরুদ্ধে সহকারী জজ আদালতে ১৯৯৬ সালে মামলা করেন তার দেবর জ্যোতিন্দ্রনাথ মন্ডল। কিন্তু আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়। আদালত রায়ে বলে, অকৃষিজমিতে বিধবা হিন্দু নারীরা অংশীদারিত্ব পেলেও কৃষিজমিতে সেই অধিকার রাখেন না।

এর বিরুদ্ধে যুগ্ম জজ আদালতে আপিল করলে আদালত মামলাটি খারিজ করে রায়ে বলে, স্বামীর কৃষিজমির ভাগ পাওয়ার অধিকার রাখেন বিধবা হিন্দু নারীরা। এরপর এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ।
আপিলের ওপর দীর্ঘ শুনানিতে কৃষি ও অকৃষি জমিতে হিন্দু বিধবা নারীরা অংশীদারিত্ব থাকার বিষয়ে ১৯৩৭ ও ১৯৪৭ সালের দুটি আইনের বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়। ওই পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট বলে, অকৃষি জমির পাশাপাশি কৃষিজমিতেও অংশীদারিত্ব পাবেন হিন্দু বিধবা নারীরা।

আদালতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মতামত দেন ব্যারিস্টার উজ্জ্বল ভৌমিক। তিনি বলেন, হিন্দুদের মধ্যে সাধারণত বিধবা নারীরা স্বামীর বসতভিটার মালিকানা লাভ করতেন। হাইকোর্টের এ রায়ের ফলে হিন্দু বিধবা নারীরা এখন থেকে কৃষিজমিরও ভাগ পাবেন। আদালতে বাদীপক্ষে অ্যাডভোকেট আবদুল জব্বার, বিধবা নারী গৌরী দাসের পক্ষে ব্যারিস্টার সৈয়দ নাফিউল ইসলাম শুনানি করেন।

সাবেক আইনমন্ত্রী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, এ রায় ঐতিহাসিক। এ রায়ের মধ্য দিয়ে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীরা উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা পেলেন। দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করা হচ্ছিল হিন্দু নারীদের বাবার এবং স্বামীর সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠায়। সম্পত্তির অধিকার না থাকায় হিন্দু বিধবাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো। তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেড়াজাল থেকে হিন্দু বিধবাদের মুক্তি খুব প্রয়োজন ছিল। এ রায়ে সমাজের অগ্রগতিও প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, যেকোনো ধর্মেই উত্তরাধিকারে নারীর সম্পত্তির সমান ভাগ পাওয়া নিশ্চিত হলেই নিপীড়ন-নির্যাতন কমে আসবে।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, হিন্দু বিধবাদের প্রাপ্য নিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা আমাদের দেশের জন্য যুগান্তকারী। এটি ইতিহাসের পাতায় ঐতিহাসিক রায় হিসেবে উল্লেখ থাকবে। আমরা আশা করি দ্রুতই এ রায়ে সুফল দেশের হিন্দু নারীরা পাবেন। কেউ যদি এর বিরোধিতা করতে আসে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের রুখে দেব। তিনি বলেন, সম্পত্তিতে নারীদের উত্তরাধিকার সমভাবে প্রতিষ্ঠার পক্ষেই আমাদের লড়াই। কিন্তু আমরা দেখি সম্পত্তিতে নারীর অধিকারে সমবণ্টন হচ্ছে না। তিনি বলেন, যিনি এ ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন তাকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই।

বাংলাদেশে মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা একটা বড় মাইলফলক। আবদুল মতিন খসরু আইনমন্ত্রী থাকাকালে আমরা সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার নিয়ে অ্যাডভোকেসি প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছিলাম। ‘কন্যা তোমার ঠিকানা কোথায়’ এ সংক্রান্ত একটি ডকুমেন্টারি করেছিলাম। যেখানে মতিন খসরু নিজেও মন্ত্রীর রোলে অভিনয় করেছেন। সেই সময় বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু হিন্দু ধর্মাবলম্বী সংসদ সদস্যরা বাধা দিয়েছেন। দীর্ঘ আন্দোলনের পর এ রায় ঐতিহাসিক। আমরা দ্রুত এর প্রয়োগ চাই। চাই সংসদে আইন। সরকারকে ধন্যবাদ দিতে চাই।

মানবাধিকার নেতা ও শিক্ষাবিদ ড. মাহফুজা খানম বলেন, ৮৩ বছরের গ্লানির অবসান হয়েছে এ রায়ে। তবে সংসদে আইন প্রণয়ন করে প্রয়োগ দ্রুত করতে হবে। পাশাপাশি সব ধর্মের নারীদের জনই সম্পত্তির সমান ভাগ চাই। নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে নারীর উত্তরাধিকারে সমান প্রতিষ্ঠা দিতে হবে।

বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি) সমন্বয়কারী জ্যোতি চট্টোপাধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণ নাগরিকের চাহিদা অনুযায়ী এটা কিছুই নয়। আমাদের দেশের চাহিদা হচ্ছে সন্তান হিসেবে সব সম্পত্তির (বাবা ও স্বামীর) অর্ধেক পাবে নারী। কিন্তু এখানে শুধু স্বামীর সম্পত্তির ভাগের কথা বলা হয়েছে। এ আইনটা পাস হওয়া উচিত সংসদে। হাইকোর্টে এ রায়টা পাস হওয়ায় এক ধরনের আশঙ্কা থেকে যায়। যে কেউ এসে এ আইনের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। তাই আমরা চাই এটা সংসদে পাস হোক।

বিধবা বৌদি স্বামীর কৃষিজমি পাওয়ার অধিকার রাখে না এমন দাবি করে ১৯৯৬ সালে খুলনা কোর্টে মামলা করেন দেবর জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল। এতে নিম্ন আদালত বলে, বিধবারা স্বামীর অকৃষি জমির অধিকার রাখলেও কৃষিজমির রাখেন না। আপিল করার পর জেলা জজ দেন ভিন্নমত। রায়ে বলা হয়, বিধবারাও স্বামীর কৃষিজমির অংশীদার হবেন। বিষয়টি গড়ায় উচ্চ আদালতে।

১৯৩৭ সালে হিন্দু বিধবা সম্পত্তি আইনে, স্বামীর অকৃষি জমির অধিকার দেওয়া হলেও কৃষিজমি থেকে বঞ্চিত করা হয় তাদের। আইনটি নিয়ে দুপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে অ্যামিকাস কিউরির মত নেয় হাইকোর্ট। পরে রায়ে জানায়, হিন্দু বিধবারা অকৃষি জমির মতো স্বামীর কৃষিজমিরও মালিক হবেন।

হিন্দু বিধবা নারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ নাফিউল ইসলাম বলেন, ‘এতদিন বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকারিত্বে যারা মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধে শাস্ত্রমতে পিণ্ডদান করতে পারেন তারাই মৃত ব্যক্তির একমাত্র সম্পত্তির উত্তরাধিকার। হিন্দুদের মধ্যে সাধারণত বিধবা নারীরা স্বামীর বসতভিটার মালিকানা লাভ করতেন। আজকের এ রায়ের ফলে হিন্দু বিধবারা স্বামীর কৃষিজমিরও ভাগ পাবেন। ’

প্রসঙ্গত, হিন্দু আইনের সবচেয়ে কঠোর অংশ হলো মেয়ে সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়টি। ১৯৩৭ সালে তৈরি এ আইনে বাবার সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় মেয়েদের। আর সীমিত ক্ষেত্রে পাঁচ পর্যায়ের হিন্দু নারীকে জীবিত থাকার শর্তে স্বামীর সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার দেওয়া হয়। তবে তাদের মৃত্যুর পর ছেলেমেয়েরা ওই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু দায়ভাগ আইন অনুযায়ী স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই পাঁচ পর্যায়ের নারী উত্তরাধিকারী হচ্ছে বিধবা, কন্যা, মাতা, পিতার মাতা ও পিতার পিতার মাতা। এ ধরনের অধিকার বিধবার সম্পত্তি বা উইডোজ এস্টেট হিসেবে পরিচিত। যদিও বিধবা ছাড়াও অন্যরা এ অধিকার পেতে পারে। তবে তা শুধু জীবনস্বত্বে। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এ সম্পত্তি পূর্ব-মৃত ব্যক্তির পুরুষ উত্তরাধিকারীর দখলে চলে যায়। সীমিত কিছু ক্ষেত্র ছাড়া এ সম্পত্তি হস্তান্তর করার অধিকার বিধবা নারীদের নেই।

দায়ভাগ আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির ছেলে থাকলে মেয়েরা সম্পত্তির ভাগ পায় না। আর যদি ছেলে না থাকে সে ক্ষেত্রে অবিবাহিত ও ছেলেসন্তান জন্মদানকারী মেয়েরা জীবনস্বত্বে সম্পত্তির অধিকার পায়। বন্ধ্যা, বিবাহিতা বা বিধবা ও মেয়েসন্তান জন্মদানকারী মেয়েরা বাবার সম্পত্তি পান না। অর্থাৎ মেয়ের অধিকার নির্ভর করে ছেলে থাকা বা না থাকার ওপর। পৃথিবীতে যতগুলো প্রাচীন আইন আছে এর মধ্যে হিন্দু আইন অন্যতম। তবে কোথায় কীভাবে এর সূচনা হয়েছে তা বিশদভাবে কারও জানা নেই।

হিন্দুদের কেউ মারা গেলে শ্রাদ্ধের সময় পিতৃকুলের শীর্ষ তিন পুরুষ ও মায়ের বংশের ঊর্ধ্বতন তিন পুরুষকে মৃতের আত্মার উদ্দেশে আতপ চাল, দুধ, কলা, মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে মণ্ড তৈরি করে নিবেদন করতে হয়। একে পিণ্ডদান বলে। পিণ্ডদানের অধিকারী ব্যক্তিরাই ‘সপিণ্ড’ নামে পরিচিত।

জীবিত ব্যক্তির পিণ্ডদানে যারা বাধ্য তারা জীবিত ব্যক্তির সপিণ্ড। এই দলে তার নিকটতম তিনজন পিতৃ পূর্বপুরুষ পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ এবং নিকটতম তিনজন মাতৃ পূর্বপুরুষ মাতামহ, প্রমাতামহ ও প্রপ্রমাতামহ অন্তর্ভুক্ত। আর কেউ মারা গেলে তিনি যাদের কাছ থেকে পিণ্ড পাওয়ার অধিকারী তারা সবাই ওই মৃত ব্যক্তির সপিণ্ড। এই দলে তার পুত্রের দিক থেকে নিম্নতম তিন পুরুষ পুত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র এবং কন্যার দিক থেকে নিম্নতম তিন পুরুষ কন্যার পুত্র, পুত্রের কন্যার পুত্র, প্রপৌত্র অন্তর্ভুক্ত। পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি মিলিয়ে উপর্যুক্ত মোট ১২ সপিণ্ড ছাড়াও তিন পুরুষের মণ্ডলী বা বৃত্তের মধ্যে যেসব পুরুষ পিণ্ডদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তারা সবাই পরস্পরের সপিণ্ড। এ নিয়মে সপিণ্ডের সংখ্যা ৩৬। এর বাইরে বিশেষ পাঁচজন নারী সপিণ্ড আছেন। যেমন বিধবা, কন্যা, মাতা, পিতামহী ও প্রপিতামহী। সব মিলিয়ে মোট সপিণ্ডের সংখ্যা ৫৩।

সকুল্যগণ সপিণ্ডের পরবর্তী সারির উত্তরাধিকারী। এরা প্রপিতামহের ঊর্ধ্বতন তিন পুরুষ। সপিণ্ডের অবর্তমানে তারা উত্তরাধিকারী হয়। আর সমানোদকরা তৃতীয় শ্রেণির ও দূরবর্তী উত্তরাধিকারী। সকুল্যের ঊর্ধ্বতন সাত পুরুষ সমানোদক হিসেবে অভিহিত। তারা সবাই পুরুষ এবং সংখ্যা ১৪৭। সপিণ্ডের কেউ বেঁচে থাকলে সকুল্য ও সমানোদকদের কেউ সম্পত্তি পাবে না। এভাবে তিন শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্রমান্বয়ে আসবে।

ফেসবুকে লাইক দিন

তারিখ অনুযায়ী খবর

ডিসেম্বর ২০২০
শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
« নভেম্বর  
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১ 
দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।