• ঢাকা
  • শনিবার, ৫ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৯শে জুন, ২০২১ ইং
Mujib Borsho
Mujib Borsho
করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল স্থগিত নিয়ে বিজ্ঞানীদের ভাবনা

বৈশ্বিক ট্রায়ালে থাকা করোনাভাইরাসের অন্যতম ভ্যাকসিন প্রার্থীর কাজ থেমে গেছে। ট্রায়ালে যুক্তরাজ্যে একজনের শরীরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়ার কারণে থামিয়ে দিতে হয়েছে সর্বশেষ ধাপের ট্রায়াল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি ভ্যাকসিনের বিকাশে কেমন প্রভাব ফেলবে তা বোঝার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় নয়। কিন্তু এ খবরটি যা বলছে তা হলো, ভ্যাকসিন অনুমোদনে আগে তার সুরক্ষার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সঠিকভাবে বড় আকারে পরীক্ষার ফলগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের গবেষকরা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে যৌথভাবে ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছে। এটি সেই নয়টি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের একটি যা কিনা সর্বশেষ বা তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালে আছে।

এ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত বিবরণ, অর্থাৎ এটি কতটা মারাত্মক এবং কখন এটি ঘটেছে তার কোনো কিছুই অক্সফোর্ড কিংবা অ্যাস্ট্রাজেনেকা প্রকাশ করেনি। কিন্তু ট্রায়াল থেমে যাওয়ার এ খবর উদ্বেগজনক।

ভ্যাকসিন গবেষক ম্যারি-পল কেনি বলেন, এই থেমে যাওয়া যা দেখায় তা হলো রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও এখানে নজরদারি রয়েছে। এটি সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে এমনকি প্রেসিডেন্টের জন্যও সত্যি কথা হচ্ছে ভ্যাকসিনের জন্য সুরক্ষা সবার ওপরে রাখতে হবে।

ভাইরোলজিস্ট ফ্লোরিয়ান ক্রামের বলেন, আমি আশা করি এ বিরূপ প্রতিক্রিয়া ভ্যাকসিনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এখন পর্যন্ত অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন দারুণ প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ট্রায়াল থামিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত বোঝায়, এ প্রক্রিয়া ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাকে মূল্যায়ন করবে এবং পাশাপাশি তারা কেবল কার্যকর ও সুরক্ষিত ভ্যাকসিনকে বাজারে আনবে।

গত মঙ্গলবার হেলথ-নিউজ ওয়েবসাইট স্ট্যাট জানায় যে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন প্রার্থীর তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় নেচারকে। তারা জানায়, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যের ট্রায়ালও স্থগিত করা হবে।

এক বিবৃতিতে অ্যাস্ট্রাজেনেকার পক্ষ থেকে বলা হয়, অক্সফোর্ড করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের বৈশ্বিকভাবে চলমান নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালের অংশ হিসেবে আমাদের স্ট্যান্ডার্ড পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চলছে এবং স্বাধীন কমিটির পরামর্শে আমরা স্বেচ্ছায় ভ্যাকসিনেশন স্থগিত করেছি সুরক্ষা ডাটা পর্যালোচনা করার জন্য।

সেখানে আরো বলা হয়, কোনো একটি ট্রায়ালে যখনই সম্ভাব্য অব্যক্ত কোনো অসুস্থতা দেখা দেয় তখন তদন্তের কারণে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ট্রায়ালের সময়সীমার মাঝে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য প্রভাব হ্রাস করতে আমরা একক ঘটনাটির পর্যালোচনা ত্বরান্বিত করার কাজ করছি। কেনি বলেন, যদি  অসুস্থতাটি নিশ্চিতভাবে কিংবা সম্ভাবনার পর্যায়েও ভ্যাকসিনের সঙ্গে যুুক্ত থাকে, তবে সেটি এ বিশেষ ভ্যাকসিন প্রার্থীর জন্য বড় ধরনের আঘাত হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘটনার তীব্রতাসহ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আরো বিস্তারিত তথ্য এবং কখন এটি ঘটেছে তা না জেনে ট্রায়ালের ওপর এর প্রভাব বুঝতে পারা ও ভ্যাকসিন অনুমোদনের সময়সীমা জানা কঠিন হবে।

ক্রস-কান্ট্রি ট্রায়াল

অ্যাস্ট্রাজেনেকা গত মাসে তার ভ্যাকসিন প্রার্থী এজেডডি১২২২-এর ট্রায়াল শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। যেখানে তাদের পরিকল্পনা ছিল দেশজুড়ে ৮০টি সাইটে ৩০ হাজার বয়স্ক মানুষকে তালিকাভুক্ত করা। এছাড়া যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকায়ও ১৭ হাজার মানুষের ওপর কার্যকারিতা বিচারের কাজ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডাবল ব্লাইন্ড ট্রায়াল চলছে প্রায় ২০ হাজার অংশগ্রহণকারীর ওপর। যাদের ডাবল ডোজ প্রদান করা হয়েছে,  যেখানে প্ল্যাসেবো গ্রহণ করে আরো ১০ হাজার জন। অনুমোদনের আগে মানুষের মাঝে এমন বড় ধরনের ট্রায়ালের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ সফল হবে, এ আশায় অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের কয়েক মিলিয়ন ডোজ অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রেখেছে। গত মাসের শেষ পর্যন্ত দেশগুলো অর্ডার দিয়েছে ২.৯৪ বিলিয়ন ডোজ। যা অন্য যেকোনো ভ্যাকসিন প্রার্থীর চেয়ে বেশি। যার এক-তৃতীয়াংশ ডোজ আবার কিনবে যুক্তরাজ্য, ইউরোপের অন্যান্য দেশ, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র।

সংক্রামক রোগ গবেষক পল গিফিন বলেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে বিরূপ ঘটনা একেবারে অপ্রত্যাশিত নয় এবং প্রায়ই তা পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত হয় না। উদাহরণস্বরূপ একটি বিরূপ ঘটনার মধ্যে একজন অংশগ্রহণকারীকে যেকোনো কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হতে পারে এবং ভর্তি হওয়ার বিষয়টি ভ্যাকসিনের সঙ্গে সম্পর্কিত না হওয়ার পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রায়ালে বিরতি দেয়া হতে পারে। গবেষণায় এমন প্রটোকল আছে যা কিনা নির্দিষ্ট করে কী ধরনের ঘটনায় বিরতি দিতে হবে এবং তারপর গিয়ে তদন্ত করা হবে এ ঘটনাটি ভ্যাকসিনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিনা। অ্যাস্ট্রাজেনেকার গবেষণা প্রটোকল এখনো জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

ফিজিশিয়ান ও বায়োএথিস্ট পল কোমেসারোফ বলেন, এটা অস্বাভাবিক না, তবে একটি নিরাপদ ভ্যাকসিনের বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অধ্যয়নের বিস্তারিত বিবরণ মানুষের সামনে প্রকাশ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, এ ট্রায়াল জনগণ দ্বারা সমর্থিত। এ রোগটি একশ বছরের মধ্যে মানবতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে। ওষুধের বিকাশের যে প্রক্রিয়া তা চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক। এর ফলাফল তখনই কেবল সফল হবে যদি জনগণের আস্থাকে সুরক্ষিত ও সমুন্নত রাখা যায়।

এরপর কী?

স্বাধীন একটি কমিটি এখন অ্যাস্ট্রাজেনেকার ডাটা পর্যালোচনা করবে। তারা দেখবে, এ অংশগ্রহণকারী যিনি কিনা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন তিনি কি ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন নাকি প্ল্যাসেবো। যদি ভ্যাকসিন গ্রহণ করে থাকেন তবে তদন্তকারীদের দেখতে হবে সেটি বিরূপ ঘটনার কারণ কিনা। বায়োএথিস্ট জোনাথন কিমেলম্যান বলেন, এটা নির্ণয় করা খুব কঠিন।

গ্রিফিন বলেন, যদি এ অসুস্থতা বেশি ও ভ্যাকসিনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তা গবেষণার ওপর বড় ধরনের আঘাত হবে। কিন্তু আমি মনে করি না এটা অনুমান করার সময় এখনো আসেনি। প্রথমে যা নিশ্চিত করতে হবে তা হলো স্বেচ্ছাসেবী নিরাপদে আছে এবং সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা লাভ করছে। তিনি আরো বলেন, আমার বিশ্বাস আছে যে গ্রুপটি সহসা এ বিরূপ ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতে পারবে এবং এ তদন্তের ফলাফল জানাতে পারবে।

এদিকে গবেষকরা উদ্বিগ্ন যে যখন মানুষ এ ভ্যাকসিন গ্রহণ করবে তখন তা তাদের বর্ধিত রোগের কারণ হতে পারে। যদিও প্রাণীদেহে করা পরীক্ষা ও মানুষের শরীরে ট্রায়ালের প্রাথমিক ধাপগুলোতে বর্ধিত রোগের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত পরিণতি জানার জন্য এখন আরো কিছুটা সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

ফেসবুকে লাইক দিন

তারিখ অনুযায়ী খবর

জুন ২০২১
শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
« মে  
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০