• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৯শে মে, ২০২২ ইং
Mujib Borsho
Mujib Borsho
করোনা রুগীর প্লাজমা থেরাপি-যে বিষয় গুলো জেনে নেয়া জরুরীঃ

ছবি-ডাঃ মোহাম্মদ আহাদ হোসেন,কনসালটেন্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল,ঢাকা।

বর্তমান সময়ে প্লাজমা থেরাপি বেশ আলোচিত একটি বিষয়। এটা নিয়ে সঠিক ধারনা দিতে বেশ কয়েকদিন কাজ করেছি। আমাদের জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সাধারন মানুষকে এ বিষয়ে সঠিক ধারনা দিতেই আজকের লেখা । লেখা ক্ষেত্রে সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য রেফারেন্স ফলো করার চেষ্টা করেছি।

প্লাজমা কি ?

প্লাজমা হলো আমাদের রক্তের একটি অংশ। রক্তের লোহিত, শ্বেত, ও অনুচক্রিকা বাদ দিলে যা থাকে তাই প্লাজমা। এর ৯৩% ভাগ পানি এবং ৭% অন্যান্য উপাদান যাদের মধ্যে আছে বিভিন্ন প্রোটিন যেমন ইমিউনোগ্লোবিন বা এন্টিবডি , ক্লটিং ফেক্টর বা রক্ত জমাট বাধার উপাদান ও অন্যান্য কিছু উপাদান। এই এন্টিবডি অংশটাই কোভিড রুগীর শরীরে কাজে লাগে।

প্লাজমা থেরাপি?

প্লাজমা থেরাপি নতুন কিছু নয়। প্রায় ১০০ বছর আগে থেকেই এই থেরাপি প্রচলিত আছে। এর আগেও Rhabes, Hepatitis B, Measles, Infuenza, Ebola, MARS, SARS এসকল জীবাণু আক্রান্তের সময়ও এই থেরাপি ব্যাবহার হয়েছে। মূলত এটা শরীর থেকে germ clearance বা জীবানু অপসারনে ভূমিকা রাখে।

কিভাবে এটা করোনা রুগীর ক্ষেত্রে কাজ করে?

যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের শরীরে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর এক ধরনের এন্টিবডি তৈরী হয় যাকে বলে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি( Neutralizing antibody) যা কিনা ELISA টেস্ট এর মাধ্যমে জানা যায়। এটাও গবেষনায় দেখা গেছে যে, যাদের এ ধরনের এন্টিবডি তৈরী হয় তাদের কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস ওই জীবাণু দ্বারা পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। বেশ কিছু প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষনায় দেখা গেছে প্লাজমা থেরাপিতে বেশ কিছু severely বা critically অসুস্থ্য করোনা রুগী সুস্থ্য হয়েছেন বা জীবানু মুক্ত হয়েছেন। আরেকটি গবেষনায় দেখা গেছে যারা লাইফ সাপোর্ট আছেন তাদের থেকে অন্যান্য critically অসুস্থ্য করোনা রুগী তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়েছেন। আমাদের দেশেও এই থেরাপি ভালো কাজ করছে বলে চিকিৎসকগন মত প্রকাশ করেছেন। তাই বলা যায় প্লাজমা থেরাপি severely বা critically অসুস্থ্য করোনা রুগীর ক্ষেত্রে একটি ভালো উন্নতি নিয়ে আসতে পারে।

ঝুঁকি আছে কিনা ?

রক্ত বা অন্যান্য উপাদান মানব শরীরে প্রবেশে যে ঝুঁকি থাকে এক্ষেত্রেও সেরকম ঝুকি রয়েছে। যেমন এলারজিক রিয়েকশন, Transfusion Associated Circulatory Overload( TACO), Transfusion associated acute lung injury ( TRALI) ফুসফুসের ক্ষতি। আর করোনার ক্ষেত্রে ফুসফুসেই ইনফেকশন হয়। তাই নিশ্চিত না হয়ে বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ক্রমেই এটা দেয়া যাবেনা। তবে আশার কথা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তথ্য বলেছে তারা ৫০০০ রুগীর মধ্যে ৭০০০ ইউনিট প্লাজমা নিরাপদেই দিতে পেরেছেন। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। প্লাজমা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সিস্টেম জড়িত থাকে যেমন ডোনার নিরাপদ কিনা, কালেকশন সিস্টেম নিরাপদ কিনা, সঠিকভাবে সংরক্ষন হয়েছে কিনা, যিনি দিচ্ছেন সঠিক ভাবে দিচ্ছেন কিনা ইতাদি। সকল স্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েই এটা দিতে হবে তা না হলে উপকারের চেয়ে ক্ষতিও হতে পারে। এক্ষেত্রে শরীরের বাইরে থেকে একটি এজেন্ট শরীরে ঢুকালে উল্লেখিত নিরাপত্তা ব্যাবস্থা সঠিক ভাবে না অনুসরন করলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থা উল্টো রিয়েকশন করতে পারে। এতে মারাত্নক ক্ষতি হতে পারে।

কতবার, কতটুকু প্লাজমা দিতে পারবে একজন ডোনার?

প্লাজমা ডোনেশনের ক্ষেত্রে রক্তের সেল বা কনিকা গুলো বাদ দিয়ে বাকী প্রোটিন গুলো নেয়া হয় । সেক্ষেত্রে শরীর স্বাভাবিকভাবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এই ঘাটতি পূরন করতে সক্ষম হয়। এই কারনে আমেরিকার ফেডারেল ড্রাগ এডমিন্সট্রেশন (এফডিএ) সাত দিনে দুইবার প্লাজমা ডোনেশন এর অনুমতি দিয়েছে। তবে দ্বিতীয়বার ডোনেশনের মধ্যে অন্তত এক দিন সময়ের ব্যাবধান থাকার কথা বলেছে। অবশ্য রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সপ্তাহে একবার প্লাজমা ডোনেশন নিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা বুঝতে পারি আমরা একাধিক বারও প্লাজমা দিতে পারি। একবারে কি পরিমান প্লাজমা দিতে পারবে সেটা ডোনারের বয়স, ওজন ও অন্যান্য অবস্থার উপর চিকিৎসক নির্ধারণ করবে।

কোন ধরনের করোনা রুগীর জন্য প্লাজমা দরকার?

১। হাসপাতালে ভর্তি করোনা রুগি
২। Severe disease condition
স্বাসকষ্ট, শ্বাস প্রশ্বাস এর হার মিনিটে ৩০ বা তার অধিক, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৩ বা তার কম,
বুকের এক্স রে তে ৫০ ভাগের বেশি আক্রান্ত হওয়া
৩। মারাত্নক খারাপ অবস্থা বা life threatening conditions
Respirattory Failure
Septic shock
Multi organ failure

কারা প্লাজমা দিতে পারবে?

১। করোনায়  আক্রান্ত রুগী যিনি ন্যাজাল সোয়াব এর পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন।
অথবা
যিনি টেস্ট করতে পারেননি, কিন্তু করোনা সন্দেহভাজন ছিলেন এবং পরবর্তীতে এন্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে করোনা এর এন্টিবডি পাওয়া গেছে।
২। করোনা এর লক্ষন সমূহ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার ১৪ দিন পর। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে শুধু নেগেটিভ টেস্টের মাধ্যমেই নিশ্চিতভাবে ডোনার নেয়া যাবে না।
৩। গর্ভবতী কোন মহিলার প্লাজমা নেয়া যাবে না । প্লাজমা নিতে হলে তার প্রেগন্যন্সি টেস্ট নেগেটিভ হতে হবে।
৪। পুরুষ বা মহিলা ডোনার HLA antibody test negative হতে হবে।
৫। ডোনারের অবশ্যই Syphilis, Hepatitis and HIV (AIDS) স্ক্রিনিং টেস্ট করে নিতে হবে।
৬। ডোনারের স্যোসাল ও ভ্রমণের ইতিহাস জেনে নিতে হবে।

প্লাজমা ডোনেশন কি নিরাপদ?

আমরা যারা নিয়োমিত রক্ত দেই তারা যেমন নিরাপদ থাকেন, প্লাজমা ডোনেশনও সেই রকম নিরাপদ। এই প্রক্রিয়ায় যে সমস্ত ব্যাগ, টিউব ব্যাবহার হয় সেগুলো একজন রুগির জন্য একবারের জন্য ও জীবানুমুক্ত উপকরন ব্যাবহার হয়। তাই নিরাপদে আপনারা প্লাজমা দিতে পারেন।

ডায়াবেটিস রুগী প্লাজমা দিতে পারবে কিনা?

এটা ডায়াবেটিস রুগীর ধরন বা তিনি কি ধরনের ঔষধ খাচ্ছেন। তার কোন ডায়াবেটিস জনিত কম্পিলিকেশন আছে কিনা। এসকল বিষয় নিয়ে চিকিৎসক এর পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি প্লাজমা দিতে পারবেন কিনা।

পরিশেষে বলতে চাই প্লাজমা করোনা চিকিৎসায় একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তবে নিরাপদ প্লাজমা দেয়া ও নেয়া নিশ্চিত করতে রেজিষ্টার্ড কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। সবাই ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

লেখকঃ
ডাঃ মোহাম্মদ আহাদ হোসেন
কনসালটেন্ট
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল,ঢাকা।

ফেসবুকে লাইক দিন

তারিখ অনুযায়ী খবর

মে ২০২২
শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
« এপ্রিল  
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১