• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

দেশ রুপান্তরের খবর

বাংলাদেশে দ্রুত রূপ পরিবর্তন করোনা দুর্বল হওয়ার লক্ষণ

দ্রুত রূপ পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের করোনাভাইরাস অনেকটাই দুর্বল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এ কারণে এখানে সংক্রমণের হার বেশি হলেও মৃত্যুহার কম। তবে সামনের হেমন্ত ও শীত ঋতুতে দেশে ভাইরাসটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, এমন আভাসও মিলেছে। এসব পয়েন্টে ভাইরাসটি রূপ বদলালে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা এখনো বলতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা।

অবশ্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস দ্রুত রূপ পরিবর্তন করলেও ভাইরাসটির মূল পয়েন্ট স্পাইট প্রোটিনের ‘এসিই-২’ জায়গায় এখনো কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিজ্ঞানীরা ফুসফুসের এই পয়েন্টকে লক্ষ্য করেই ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। তাদের লক্ষ্য ভাইরাসের এই জায়গাটা নষ্ট করে ফেলা। কারণ এখানেই করোনাভাইরাস বসে সংক্রমণ ছড়ায়।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরি করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স গবেষণা প্রকাশ করে। পরে সে গবেষণার নানা দিক নিয়ে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে দেশ রূপান্তর এসব তথ্য পেয়েছে।

বিসিএসআইআর গবেষণায় পেয়েছে,  বাংলাদেশে করোনাভাইরাসটি অনেক দ্রুতগতিতে রূপ পরিবর্তন করছে। বিশ্বে করোনাভাইরাসের রূপান্তরের হার ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস রূপান্তরের হার ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাসে মোট ২৮টি প্রোটিন থাকে।

এর মধ্যে একটি হচ্ছে স্পাইক প্রোটিন, যার মাধ্যমে বাহককে আক্রমণ করে। করোনার নমুনা বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, স্পাইক প্রোটিনে ৬১৪তম অবস্থানে অ্যাসপার্টিক এসিডের পরিবর্তন হয়ে গ্লাইসিন হয়েছে। এতে ‘জি৬১৪’ নম্বর ভ্যারিয়েন্টটি শতভাগ ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এই আধিপত্যের কারণে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, সারা বিশ্বে সব মিলিয়ে ৬ ধরনের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ২৬৩টি করোনাভাইরাস পর্যবেক্ষণ করে বিসিএসআইআরের গবেষকেরা ৪ ধরনের২৪৩টি জিআর ক্লেড, ১৬টি জিএইচ ক্লেড, ৩টি জি ক্লেড এবং ১টি ও ক্লেড করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পেয়েছেন। এছাড়া করোনার নমুনাগুলোর শতভাগ ক্ষেত্রে মোট ৪টি মিউটেশনে পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা গেছে। এসব পরিবর্তন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য মূলত দায়ী।

গবেষণায় দেশে এ পর্যন্ত ৩২৫টি করোনাভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জীবন নকশা বের করা হয়েছে। এর মধ্যে বিসিএসআইআরের জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরির গবেষকরা ২৬৩টি করোনাভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ জীবন নকশা বের করেছেন। এই ২৬৩টি ভাইরাসের জিন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, দেশের করোনাভাইরাসগুলোর জিনোমিক পর্যায়ে ৭৩৭টি পয়েন্টে রূপান্তর (মিউটেশন) হয়েছে।

দেশে করোনাভাইরাসের দ্রুত রূপ পরিবর্তন কিসের ইঙ্গিতজানতে চাইলে বিসিএসআইআরের প্রধান বিজ্ঞানী ড. সেলিম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা ভাইরাস যদি দ্রুত পরিবর্তন হয় এবং পরিবর্তন যদি ঘুরেফিরে একই জায়গায় হয়, তাহলে বলতে গেলে সেই ভাইরাস দুর্বলই হয়। এই ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। যেহেতু আমরা ঘুরেফিরে পরিবর্তনগুলো নির্দিষ্ট চারটি জায়গায় পাচ্ছি, সে কারণে ভাইরাসটি এখানে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমাদের মনিটরিং করতে হবে যে পরিবর্তনটা অন্য জায়গায় হয় কি না এমন সতর্ক করে এই বিজ্ঞানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা দেখেছি ঘুরেফিরে চার জায়গায় পরিবর্তন পেয়েছি। একটা পরিবর্তন কমন পাচ্ছি স্পাইক প্রোটিনের ‘৬১৪ নম্বর’ জায়গায়। এখন আমাদের সামনে দুটি ঋতু আসছে হেমন্ত ও শীত। তাপমাত্রাভেদে এই ভাইরাস তার রূপ পরিবর্তন করে। সেটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দেখতে হবে পরিবর্তনটা শক্তিশালী হচ্ছে, নাকি দুর্বল হচ্ছে। এ পর্যন্ত আমরা যেটা পেয়েছি মিউটিশন বা পরিবর্তনগুলো একই জায়গায় হচ্ছে। যে কারণে করোনাভাইরাস আমাদের দেশে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে যে পরিমাণ সংক্রমণ হচ্ছে, সে পরিমাণ মৃত্যু হচ্ছে না।

এই বিজ্ঞানী পরামর্শ দেন, পরিবর্তন খেয়াল রাখতে হবে। সিকোয়েন্স করে যেতে হবে। এটা সঠিকভাবে করতে পারলে সামনের দিনগুলোতে কীভাবে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে ব্যবস্থা নিতে পারব।

ড. সেলিম খান করোনাভাইরাসের পরিবর্তনের কিছু মারাত্মক পয়েন্টের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এখানে ভাইরাসটির পরিবর্তনে ৬১৪ নম্বরসহ মারাত্মক কিছু পয়েন্ট আছে। সেই জায়গাগুলোতে এখনো মিউটেশন পাইনি। ভাইরাসের বাইরের আবরণে স্পাইক প্রোটিনে ৩১৫-৫২০ পর্যন্ত একটা অংশ থাকে। সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো মিউটেশন পাইনি। আমরা পরিবর্তন পাচ্ছি এই পয়েন্টগুলো থেকে কিছুটা দূরে স্পাইক প্রোটিনের ৬১৪ নম্বরে। সাধারণত এসব মারাত্মক পয়েন্টে মিউটেশন হলে ঠিক কী ঘটত বলতে পারছি না। কারণ করোনাভাইরাসের স্বরূপ বলা মুশকিল, কারণ এটা আবহাওয়াভেদে রূপ বদলায়। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম সৌদিআরবে করোনাভাইরাস হবে না। কিন্তু সেখানে অনেক সংক্রমণ হয়েছে ও অনেক লোক মারা গেছে। অর্থাৎ ভাইরাসটি নিজের মতো নিজে পরিবর্তন হচ্ছে।

বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে কেন জানতে চাইলে এই বিজ্ঞানী বলেন, সেটা আমাদের আবহাওয়ার কারণে হতে পারে। ষড়ঋতুর দেশ, সে কারণে হতে পারে। এখানে দু’মাস পরপর ঋতু পরিবর্তন হয়। এ ছাড়া আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক দেশের চেয়ে বেশি। সে কারণেও এত দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। আমাদের মৃত্যুহার কমার জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও একটা কারণ।

ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স কেন দরকার জানতে চাইলে এই বিজ্ঞানী বলেন, ভাইরাস আবিষ্কারের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। কারণ আমরা যখন কোনো ভাইরাসের জীবনরহস্য জেনে যাব ও উদঘাটন করব, তার স্বরূপ জানতে পারছি, তখন ভ্যাকসিন তৈরি সহজ হয়। সঠিক ভ্যাকসিন তৈরির একমাত্র উপায় ভাইরাসের সিকোয়েন্সে জানা। আমরা যে সিকোয়েন্স করছি, সেগুলো ডাটা ব্যাংকে জমা দিচ্ছি। পৃথিবীতে যারা ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে, তাদের প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। উপরন্তু আমরা এই ডাটাগুলো বিশ্লেষণ করে ১১ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ তৈরি করেছি। ই-মেইলের মাধ্যমে সেটা ভ্যাকসিন কোম্পানিগুলোর কাছে পৌঁছে দিয়েছি।

একইভাবে বিসিএসআইআরের আরেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আহসান হাবীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাঁচটি স্বতন্ত্র জিনোম পেয়েছি। সেখানে চারটি শুধু বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। এগুলো বিশ্বের আর কোথাও নেই। দেশে একেবারেই নতুন। এ কারণে চারটি একেবারেই নিজস্ব। অর্থাৎ এই পরিবর্তনটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। এসব বাহক অন্য কোনো দেশ  থেকে রোগটি বহন করে আনেনি।

এই বিজ্ঞানী বলেন, এই রেজাল্ট যারা ভ্যাকসিন তৈরি করছেতাদের দিয়েছি। বলেছি, তারা যখন ভ্যাকসিন তৈরি করবে, তখন বাংলাদেশের সিকোয়েন্সের কথা মনে রাখবে। ফলে ভ্যাকসিন তৈরির সময় তারা বাংলাদেশের বিষয়টি বিবেচনায় নেবে ও আমাদের জন্য যে ভ্যাকসিন তৈরি হবে, সেটা কার্যকর হবে। সিকোয়েন্সের এটাই মূল উদ্দেশ্য।

দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এখন যেসব ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে, সেখানে প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে ড. আহসান হাবীব বলেন, ‘এসিই-২’ নামে ফুসফুসের মধ্যে একটি জায়গা আছে, সেখানে ভাইরাসটা বসে। এই ভাইরাস ফুসফুসে হয়। এখন বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছে যেখানে ভাইরাসটা বসে, সেই বসার জায়গাটা নষ্ট করে দেবে। অন্য জায়গা ধরতে পারছি না। ফলে যতই পরিবর্তন করুক, স্পাইক প্রোটিন  ‘এসিই-২’ মূল লক্ষ্য। সেটাই ভ্যাকসিনের ফোকাস। এখন পর্যন্ত এই জায়গাটা ঠিক আছে। পরিবর্তন হয়নি। সে জন্য বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য স্পাইক প্রোটিনের ‘এসিই-২’ জায়গাটা নষ্ট করা। এটাকে লক্ষ্য করেই ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে। ফলে রূপ পরিবর্তন হলেও ভ্যাকসিন কার্যকর হওয়ার এখন পর্যন্ত আশা আছে।

তবে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অভিন্যু কিবরিয়া ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে তিনশ-সাড়ে তিনশ জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। ভাইরাস রূপান্তরের হার ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ। বিশ্বে হয়েছে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার। রূপান্তরের হার ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। ফলে প্রচুর পার্থক্য। জিনোম সিকোয়েন্স অনুপাতে এই পার্থক্য খুব একটা বেশি না। দ্বিতীয়ত,  প্রত্যেকটা মিউটেশন ভাইরাসের একটা পার্থক্য তৈরি করে। সাধারণভাবে আমরা বুঝি করোনাভাইরাসের মিউটেশনের একটা প্রুফ রিডিং ক্ষমতা আছে। এটার জন্য করোনাভাইরাস আবার তার আগের রূপে ফিরে যায়। এ কারণে করোনাভাইরাসের রূপান্তর কম হয়। তবে বেশি রূপান্তর হলে করোনাভাইরাস দুর্বল হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। আবার দু’একটা মিউটেশন এমন হয়, যে কারণে সংক্রমণ বেশি হয়। অনেক মিউটেশন আছে যেটা করোনাভাইরাসকে ছড়াবে, কিন্তু রোগ তৈরি করবে না। এখন এসব মিউটেশন বিশ্লেষণ না করে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত বলা যায় না।

গতকাল  গবেষণা প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ও সভাপতি ছিলেন বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আফতাব আলী শেখ।

ফেসবুকে লাইক দিন

তারিখ অনুযায়ী খবর

দুঃখিত! কপি/পেস্ট করা থেকে বিরত থাকুন।